একটি সফল সামিট

0
580

[গত ৭ ও ৮ ডিসেম্বর ২০১৮ হয়ে যাওয়া আইপিডিসি উদ্যোক্তা সামিট নিয়ে লিখেছেন প্রীতি ওয়ারেছা]

কোন আয়োজনের উদ্দেশ্য যখন প্রয়োজনকে স্পর্শ করতে পারে ঠিক তখনই আয়োজন সফল হয়। ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকে সম্প্রতি শেষ হওয়া দুইদিনব্যাপী ‘আইপিডিসি উদ্যোক্তা সামিট ২০১৮’-এর উদ্দেশ্য ছিল উদ্যোক্তাদের নিজেদের মধ্যে সেতুবন্ধন বা নেটওয়ার্ক তৈরি করা এবং  ব্যবসাক্ষেত্রে নানাবিধ সমস্যার সমাধান কিংবা ব্যবসা বৃদ্ধি কল্পে ইন্ডাস্ট্রির পাইওনিয়ারদের সঙ্গে উদ্যোক্তাদের সরাসরি আলোচনা করার সুযোগ সৃষ্টি করা। আমার ধারণা উদ্যোক্তা সামিট সেটা করতে সমর্থ হয়েছে।

সামিটের কিছু প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলা যেতে পারে। বিভিন্ন সেক্টরের পাইওনিয়ার, বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তাদের যুথবদ্ধ অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে এই সামিটে উল্লেখযোগ্যভাবে যে বিষয়টি বেরিয়ে এসেছে তা হলো বাণিজ্যের মূল উপাদান আসলে ইনোভেটিভ আইডিয়া ও নেটওয়ার্কিং। তবে ইনোভেটিভ আইডিয়া কেবল উদ্যোগ গ্রহণের প্রাথমিক ভাবনাতেই প্রযোজ্য নয়, প্রচলিত যেকোন ভাবনা নিয়ে কাজ করলে, সেটার বাস্তবায়নক্ষেত্রেও অভিনবত্ব আনা অাবশ্যক। নইলে বাজারে নিজেকে আলাদাভাবে উপস্থাপন করা এমনকি অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই কঠিন হতে পারে। মজার ব্যাপার হলো বিশেষজ্ঞ মতামত বলছে ব্যবসায়ীক উদ্যোগের ক্ষেত্রে মূলধণ বিষয়ক ভাবনা নাকি একেবারেই গৌণ! স্টার্টআপ উদ্যোক্তাগণ হয়ত বিষয়টার সঙ্গে একমত হতে পারবেন না। টাকা ছাড়া কিছু হয় নাকি! যে কোন উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে মূলধণ অবশ্য প্রয়োজনীয় একটি উপাদান যেটা বারবার করে সামিটের বিভিন্ন ইন্টারেক্টিভ সেশনে উদ্যোক্তাগণ উল্লেখ করেছেন, জানিয়েছেন নিজেদের ব্যবসা বৃদ্ধি না করতে পারার কারণ মূলধণহীনতা। অথচ মূলধণ সামগ্রিক ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে অবধারিত কোন প্রতিবন্ধকতা নয় –  ইন্ডাস্ট্রির পাইওনিয়ারবৃন্দ সেটা সোজাসাপটা জানিয়ে দিয়েছেন! স্টার্ট আপদের জন্য পরামর্শ স্বরূপ তারা উল্লেখ করেছেন MVP (minimum viable product) নিয়ে কাজ করতে এবং প্রাথমিক অবস্থায় আর্থিক সহযোগিতা পেতে ব্যাংক কিংবা অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে না গিয়ে পারিবারিক উৎস কিংবা এঞ্জেল ইনভেস্টরের কাছ থেকে চাহিদা মেটাতে। আশা করি উদ্যোক্তাগণ নিজেদের প্রাথমিক সংগ্রাম উৎরে উঠবেন এবং তখন বিশেষজ্ঞ মতামত তাদের কাছে প্রাসঙ্গিক মনে হবে।

ব্যাংক ও অর্থ লগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান থেকে উদ্যোক্তাদের ঋণ আবেদন নাকচ হওয়ার নানাবিধ কারণসমুহ একটি সেশনে দারুণভাবে উঠে এসেছে বিনিয়োগকারীদের আলোচনা মারফত। কারণগুলো খুব সাধারণ, কেবলমাত্র সেসবে গা না নেয়ার কারণে উদ্যোক্তারা ঋণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

সামিটের দ্বিতীয়দিনে এফিলিয়েট মার্কেটিং বিষয়ক সেশনটি আমার কাছে একেবারে অভাবনীয় ঠেকেছে! ক্ষুদ্র বিনিয়োগে কেবলমাত্র শ্রম ও অধ্যাবসায়কে পুঁজি করে হাজার হাজার তরুণ মার্কেটার এই সেক্টরে দুর্দান্ত কাজ করছেন। পড়ালেখার পাশাপাশি তো করছেনই, অনেকেই আবার এফিলিয়েট মার্কেটিংকে ফুলটাইম ক্যারিয়ার হিসেবেও নিয়েছেন। আমার জানা ছিল না এখানে সফলভাবে কাজ করছেন নারীরাও! এবারের উদ্যোক্তা সামিটে অংশগ্রহণকারী বেশিরভাগ উদ্যোক্তাই তার প্রতিষ্ঠানের একক প্রতিনিধি কিংবা বলা যেতে পারে একহাতে প্রতিষ্ঠানের সবদিক পরিচালনাকারী। সামিটের বিভিন্ন সেশন সাজানোই হয়েছে উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে এবং ব্যবসা পরিচালনাক্ষেত্রে সার্বিক দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করতে কারণ আগামীর বিশ্ববাজার নিয়ন্ত্রণ করবে উদ্যোক্তাগণই। সুতরাং সবমিলিয়ে সামিটে অংশগ্রহণকারী ক্ষুদ্র, মাঝারি এমনকি হেভিওয়েট উদ্যোক্তাগণ উপকৃত হয়েছেন বলেই আমার ধারণা।

সামিটে বিভিন্ন বিষয়ের ওপরে ১১টি সেশন ও ৪টি কর্মশালা ছিল। কিছু সেশনের আলোচনায় মনে হয়েছে কিছু জায়গায় উদ্যোক্তারা বেশ অসহায়। যেমন; ব্যাংক কিংবা অন্যান্য অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান উদ্যোক্তাবান্ধব না এখন পর্যন্ত। ঋণ, সুদের হার ও কিস্তি বিষয়ক পলিসি মেকিংয়ের জায়গায় উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ নাই। একজন বিনিয়োগকারীকে বলতে শুনলাম সাপ্লাই চেইনভুক্ত ব্যবসার ক্ষেত্রে তারা উদ্যোক্তাকে জামানতছাড়াই তারা কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা দিয়ে থাকেন। কথা হলো সব ব্যবসার ধরণ কিন্তু সাপ্লাই চেইন না! সেক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে জামানতহীন ঋণ সুবিধা পাওয়া একদিকে যেমন কঠিন, আবার অন্যদিকে সব ক্রাইটেরিয়া ফুলফিল করে ঋণ সুবিধা পেলেও প্রায় সাথেসাথেই কিস্তি পরিশোধ শুরু করতে হয়। কিস্তি পরিশোধের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাগণ নিজেকে প্রস্তুত করার যথেষ্ট সময় পান না বললেই চলে। উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীর মধ্যে সহনীয় একটা সময়ভেদ থাকা উচিত। সামিটে এই বিষয়টা আলোচনায় আসলে উদ্যোক্তাগণ উপকৃত হতেন।

সামিটে বিভিন্ন সেক্টরের লিডারদের সমন্বিত ইন্টারেক্টিভ সেশন ছিল উৎসাহব্যঞ্জক বা প্রণোদনাদায়ী। যদিও সেশনের বেশিরভাগটা জুরেই ছিল স্টার্টআপদের জন্য মোটিভেশনাল স্পিচ। আমি বলছিনা সেটা জরুরী না, তবে উপযোগী হতে পারতো সেক্টরভিত্তিক বিটুবি (বিজনেজ টু বিজনেজ) সেশন। যেহেতু বড় বড় ইন্ডাস্ট্রি তাদের নিত্য প্রয়োজনীয় প্রচুর পণ্য আউটসোর্স করে সুতরাং সেক্টরভিত্তিক বিটুবি সেশনের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের প্রোডাক্ট কিংবা সার্ভিস সেই ইন্ডাস্ট্রির লিডারদের কাছে সহজেই উপস্থাপন করা সহজ হতো এবং এই পন্থায় পারস্পরিক ব্যবসায়িক উদ্যোগের সুযোগ সৃষ্টি হলে স্টার্টআপরা অনেকবেশি উপকৃত হতো। তবে আয়োজনের ব্যাপকতার কাছে এ সবই ক্ষুদ্র পর্যালোচনা। সামনের পরিকল্পনাগুলো আরো জোরালোভাবে উদ্যোক্তাদের প্রয়োজন ও স্বার্থ রক্ষার্থে সাজানো হবে সেই প্রত্যাশা রাখি।