হার না মানা তনুজা

১৯৯৭-৯৮ সালে যশোর-ঝিনাইদহ জেলার কয়েকটি প্রত্যন্ত গ্রামে এক তরুণীকে মোটরসাইকেলে করে ঘুরে বেড়াতে দেখা যেত। তরুণী তাঁর ভাইয়ের পেছনে বসে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যেতেন। তনুজা আপার আসার খবর পেয়ে মহিলারা এসে পড়তেন বাতিল কাপড় ও সুঁই-সুতা নিয়ে, কাপড়ে সুচিকাজ শেখার জন্য। আবার কোনো না কোনো মহিলার স্বামী এসে হাজির হতেন সেখানে, তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে যেতেন। তনুজা আপার প্রতিষ্ঠানের কাজ করে এখন তাঁদের কারও কারও মাসিক আয় সাত থেকে সাড়ে সাত হাজার টাকা, বেশির ভাগেরই কমপক্ষে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা। আর যাঁরা নতুন, তাঁরাও শুরুতে ৭০০ টাকা পর্যন্ত আয় করেন। তনুজা রহমানের (কর্মীদের কাছে মায়া আপা নামে পরিচিত) রঙ হ্যান্ডিক্রাফটসের মাধ্যমে ভাগ্য পরিবর্তন হয়েছে যশোর-ঝিনাইদহের নোঙ্গরপুর, মহেশপুর, ঝিকরগাছা, কয়েলখালী, শংকরপুরসহ বেশ কিছু গ্রামের তিন হাজারেরও বেশি নারীর!

যশোরের মুজিব সড়কের রেলগেটে রঙ হ্যান্ডিক্র্যাফটসের দুই হাজার ২০০ বর্গফুটের বিশাল শোরুম। যশোর আর খুলনায় তাঁর আরও দুটি শোরুম রয়েছে। পণ্যসামগ্রীর মধ্যে রয়েছে ঘর সাজানোর জন্য নকশিকাঁথা, বেডকভার, পর্দা, কুশনকভার, ফ্লোর কুশন, মেয়েদের শাড়ি, থ্রিপিস, শাড়ির সঙ্গে ওড়না, কটন শাল, ফতুয়া, ছেলেদের জন্য পাজামা-পাঞ্জাবি, ফতুয়া, টি-শার্ট আর শিশুদের জামা, ফতুয়া ইত্যাদি। সবকিছুর মূল বৈশিষ্ট্য হলো সবই রঙের নিজস্ব ডিজাইনে তৈরি।

দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ার সময় বাবাকে হারানো, অষ্টম শ্রেণীতে পড়ার সময় বিয়ে। আর দশটা বাঙালি মেয়ের মতো স্বামী-ছেলে-মেয়েকে নিয়ে ঘরকন্নাতে থাকতে পারতেন তনুজা। কিন্তু তিনি নিজেই পায়ে দাঁড়াতে চেয়েছেন। মায়ের কাছ থেকে শেখা হাতের কাজকে উন্নত করেছেন। ভাই ও আত্মীয় স্বজনদের উপহার দিয়েছেন। ১৯৯৬ সালে তাঁর উন্নতমানের কাজ দেখে অনেকেই পরামর্শ দিলেন বাণিজ্যিকভাবে শুরু করার। মাত্র পাঁচজন মেয়েকে নিয়েই শুরু হলো তনুজার নতুন প্রচেষ্টা। সংসারের খরচ বাঁচিয়ে তখন তাঁর হাতে ২০ হাজার টাকার মতো। আস্তে আস্তে তনুজার কাজের খবর ছড়িয়ে পড়ল আশপাশে। পাড়া-প্রতিবেশীদের ছাড়িয়ে হাজির হয়ে গেল বিভিন্ন দোকানদার। লট ধরে অর্ডার দিতে শুরু করল। বানিয়ে কূল পাওয়া দায়! ভাবলেন, বড় করবেন কাজ। কিন্তু যশোর শহরে কর্মী পাওয়া গেল না।

‘বুঝলাম শহরে থাকলে আমার হবে না। গ্রামের দিকে গেলে অনেককে পাওয়া যাবে যারা সেলাইয়ের কাজ পারে।’ শুরু হলো গ্রামে যাওয়া। সঙ্গে নিলেন দুই ভাইকে।

শুরু হলো তনুজার নতুন সংগ্রাম। প্রথম পর্যায়ে শংকরপুরের কয়েকজন। শর্ত হলো যাঁরা শিখবেন, তাঁরা অন্যদেরও শেখাবেন। এভাবে বাড়তে লাগল তাঁর কর্মী। ঠিক হলো ৫০ জনের দলের জন্য থাকবেন একজন লিডার। এরই মধ্যে রঙের কথা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। বাসা থেকে কাজ করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তাই ২০০০ সালে যশোর মুজিব রোডের রেলগেট এলাকায় চালু হলো প্রথম শোরুম, সঙ্গে একটি ছোট কারখানা। এখন দুটি কারখানায় মূল কাজ হয়, যেমন কাপড় কেটে জামা বানানো, ডিজাইন ঠিক করা ইত্যাদি। আর হাতের কাজ হয় গ্রামে। দূর-দূরান্তের গ্রাহকের সংখ্যা বাড়তে থাকল। যে রেলগেট এলাকায় তেমন কোনো দোকানপাট ছিল না, সেখানে লোকে লাইনে দাঁড়িয়ে কাপড় কিনতে শুরু করল রঙ থেকে!

‘ক্রেতাদের কাছ থেকে অগ্রিম নিয়ে দোকানটি নিয়েছিলাম। কিন্তু সেভাবে তো ব্যবসা বড় করা যায় না। ২০০৫ সালে ব্যাংক থেকে আট লাখ টাকা ঋণ নিলাম।’

এ দিয়ে ব্যাপ্তি বাড়ল। দুই ভাইয়ের একজন দোকানের কাজে আর একজন মাঠের কাজে সাহায্য করতে শুরু করলেন। এরপর একটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে ৩০ লাখ টাকা ঋণ নিলাম। চালু হলো রঙের দুই হাজার ২০০ বর্গফুটের শোরুম। ঋণের বাকি টাকায় করা হলো ব্যবসার সম্প্রসারণ। এখন তিনটি শোরুম আর দুই কারখানায় কাজ করছেন ৬৫ জন। ১০০ জনেরও বেশি আছেন লিডার। আর গ্রামের মোট কর্মীর সংখ্যা তো তিন হাজার ছাড়িয়ে গেল।

যাঁরা চাকরি না করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখেন, তাঁদের জন্য তনুজার দুটি মন্ত্র: ইচ্ছে ও একাগ্রতার সঙ্গে যে কাজটা করা হবে, সেটি ভালোভাবে আত্মস্থ করতে হবে প্রথমে, প্রশিক্ষণ, শিক্ষার মাধ্যমে। তারপর লেগে থাকতে হবে।’
২০১০ সালে এসএমই ফাউন্ডেশন তাঁকে বছরের সেরা নারী উদ্যোক্তা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।

লিখেছেনঃ মুনির হাসান

পূর্ব প্রকাশ – প্রথম আলো, ১৬ মার্চ, ২০১১