খ্যাতিমান উদ্যোক্তা ক্যামেরন হ্যারল্ডের জন্ম কানাডায়। মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি প্রথম ব্যবসা শুরু করেন। শুরুটা সামান্য দিয়ে হলেও আজ তিনি একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। বিভিন্ন দেশে নতুন উদ্যোক্তাদের তিনি প্রশিক্ষণও দিয়ে থাকেন। তাকে নিয়ে লিখেছেন প্রাঞ্জল সেলিম
তার পড়াশোনা খুব বেশিদূর এগোয়নি। পড়াশোনার পাঠ শেষ না করেই তিনি ব্যবসার খাতায় নাম লেখান। ছেলেবেলা থেকেই বুঝেছিলেন যে, তাকে দিয়ে পড়াশোনা হবে না। বরং ব্যবসার প্রতি তার ছিল প্রচণ্ড আগ্রহ। পাশাপাশি তিনি একজন নামকরা উদ্যোক্তা হতে চেয়েছেন। ছোটবেলায় আমাদের অনেকের অনেক রকমের স্বপ্ন থাকে, শখ থাকে; জীবনে অনেক কিছু করার প্রবল ইচ্ছা থাকে। আর যখন বড় হয়ে যাই, আস্তে আস্তে সেসব স্বপ্ন বিবর্ণ হতে হতে মিলিয়ে যায়। আমাদের শুধু বলা হয়, পড়াশোনা করতে হবে, আরও অনেক পড়তে হবে প্রতিদিন, আরও মনোযোগী হতে হবে!
হ্যারল্ডের জন্য বাসায় শিক্ষক রাখা হয়েছিল কিন্তু তাতে লাভ হয়নি কোনো। একবার এমআইটির (ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি) ব্যবসায় উদ্যোগ-বিষয়ক মাস্টার্স প্রোগ্রামে আমি সেরা প্রভাষক নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। সেখানে তাকে সারা পৃথিবী থেকে আসা উদ্যোক্তাদের সামনে বক্তব্য দিতে হয়েছিল। তিনি যখন দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়েন, তখন শহরের একটা বক্তব্য প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার পেয়েছিলেন। কিন্তু তখন তাকে উত্সাহ জোগানোর কেউ ছিল না। তিনি আজ যা তা তার সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায়। সেই চেতনা থেকে আজ তিনি একজন উদ্যোক্তা বানানোর কারিগর হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি মনে করেন, এভাবে যদি কেউ এগিয়ে না আসে তবে, আমরা অনেক সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাকে নিজেদের অজান্তেই হারিয়ে ফেলতে পারি। আর এ কারণে তিনি এমন প্রতিভাবান তরুণ উদ্যোক্তাদের স্বপ্নপূরণে সাহায্য করতে চান। এই বিষয়ে তিনি বলেন, ‘একটি প্রাচীন প্রবাদ আছে, তুমি যদি কাউকে একটি মাছ দাও, তাহলে তুমি তার একদিনের খাবারের ব্যবস্থা করলে। কিন্তু তুমি যদি কাউকে মাছ ধরা শেখাও তাহলে তুমি তার সারা জীবনের খাবারের ব্যবস্থাই নিশ্চিত করে দিলে।’ তিনি মনে করেন, অভিভাবক ও সমাজের সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের উচিত শিশুদের হাতে মাছ তুলে না দিয়ে তা ধরতে শেখানো। আমরা যদি উদ্যোক্তা হওয়াকে একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যত্ হিসেবে মেনে নিয়ে ছেলেমেয়েদের উদ্যোক্তা হতে উত্সাহ আর সহায়তা দিই, তাহলে সরকারকে আর কখনও বেকারসমস্যা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। এমবিএ প্রোগ্রামে কখনও উদ্যোক্তা হতে শেখানো হয় না। সেখানে শুধু শেখানো হয়, কীভাবে বড় বড় কোম্পানির হয়ে চাকরি করতে হবে।
এখন সেই একই বিষয়ের বইয়ে আমার উদাহরণও দেওয়া আছে। সারা কানাডার শিক্ষার্থীরা তা পড়ছে। বইটি লেখার সময় তারা যখন আমার সাক্ষাত্কার নিতে এসেছিলেন, আমি বলতে পারিনি যে, বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে এই কোর্সে আমি কীভাবে পাস করেছিলাম! উদ্যোক্তা হতে হলে এমবিএ করতেই হবে, স্কুলে ভালো ফল করতেই হবে—এমন কোনো কথা নেই। আমরা কেন শিশুদের শেখাই না যে, টাকাপয়সা যখন খুশি খরচ না করে কীভাবে জমিয়ে পরে ভালো কিছু করা যায়? আমি বড় রাস্তায় একবার একটা পয়সা ফেলে দেওয়ায় আমার বাবা আমাকে একা একা রাস্তার মাঝখানে গিয়ে সেটা তুলে আনার আদেশ করেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি খুব কষ্ট করে টাকা উপার্জন করি। আর তাই একটি পয়সাও নষ্ট হওয়া দেখতে চাই না।’ সেদিনের কথা আমি আজও ভুলিনি। হাতখরচ শিশুদের একটি বাজে ব্যাপারে অভ্যস্ত করে তোলে। এটি তাদের ‘বেতন’ আশা করতে শেখায়। একজন উদ্যোক্তা কখনও নির্দিষ্ট অঙ্কের বেতনের পেছনে ছোটেন না। আমার তিন ছেলেমেয়ে। আমি তাদের বলি বাড়িতে কোথাও কিছু ঠিকঠাক করা বা গোছানোর দরকার আছে কি না, তা খুঁজে বের করতে। তারা আমাকে এসে জানায়। তারপর আমরা আলোচনা করে ঠিক করি, কোনো একটি নির্দিষ্ট কাজের জন্য তাদের আমি কত পারিশ্রমিক দিতে পারি! হ্যাঁ, মাঝেমধ্যে আমরা দর-কষাকষিও করি! কিন্তু এতে তাদেরই উপকার হয়। তারা চারপাশ থেকে সুযোগ খুঁজে নিতে শেখে, নিজের কাজ নিজেই করতে শেখে। এ ছাড়া কীভাবে কাজের যথাযথ দাম আদায় করতে হয়, তা-ও শিখে নেয়।’ হ্যারল্ডের ব্যবসার মূল উদ্দেশ্য হলো এমন আগ্রহী শিশু, কিশোর ও তরুণদের তাদের লক্ষে পৌঁছাতে সহায়তা করা। আর কীভাবে এই বিষয়গুলো তিনি দেখেন তার একটি বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ‘শিশুদের ঘুমানোর সময় প্রতিদিন গল্প না শুনিয়ে সপ্তাহে তিন দিন অন্তত তাদের গল্প বলতে দেওয়া উচিত। তাদের জামাকাপড়, খেলনা কিংবা কম্পিউটার নিয়েই কিছু বলতে দিয়ে দেখুন না, সে কী গল্প বানায়! আমার সন্তানদের আমি এমনটি প্রায়ই করাই, এতে তারা সৃজনশীল হতে শেখে, নিজেদের মতো করে আনন্দও পায়। তাই শিশুদের কথা বলতে দিন, যা কিছু নিয়েই হোক না কেন। উদ্যোক্তা হতে হলে এসব দক্ষতা খুব প্রয়োজন। আমরা নিজেদের জীবনে এগুলো নিয়ে সমস্যায় পড়লেও আমাদের শিশুদের গড়ে তোলার বেলায় এগুলোর কথা ভুলে যাই, আমরা শুধু ক্লাসের পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য প্রাইভেট টিচার দিয়েই মনে করি দায়িত্ব শেষ! কিন্তু না, তাদের নেতৃত্ব দিতে শেখাতে হবে। তাদের মনে মূল্যবোধ জাগিয়ে তুলতে হবে, আত্মনির্ভরশীল হতে শেখাতে হবে।’ আর এসব বিষয় মাথায় নিয়ে দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন ক্যামেরন হ্যারল্ড।
প্রাঞ্জল সেলিম
সুত্রঃ ইত্তেফাক।
