ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ঋণ পেতে যা লাগবে

0
405

বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাত। এই খাত দেশের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে। এসএমই উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম সম্প্রসারণ ও নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য প্রায়শই ঋণের প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য বিভিন্ন ধরনের ঋণ সুবিধা প্রদান করে থাকে। তবে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট কাগজপত্র জমা দিতে হয় এবং কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়। এই ফিচারে বাংলাদেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে এসএমই ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, শর্তাবলি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো। তথ্য সংকলনে ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্টের প্রফেশনাল ফেলো আশা জাহিদ।

এসএমই ঋণের প্রকারভেদ:

বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এসএমই উদ্যোক্তাদের চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের ঋণ প্রদান করে থাকে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

  • মেয়াদি ঋণ (Term Loan): দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ যেমন যন্ত্রপাতি ক্রয়, কারখানা স্থাপন বা সম্প্রসারণের জন্য এই ঋণ প্রদান করা হয়।
  • চলতি মূলধন ঋণ (Working Capital Loan): ব্যবসার দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য, যেমন কাঁচামাল ক্রয়, বেতন প্রদান বা দেনা পরিশোধের জন্য এই ঋণ নেওয়া হয়।
  • ডিমান্ড লোন (Demand Loan): স্বল্পমেয়াদি আর্থিক চাহিদা পূরণের জন্য এই ঋণ প্রদান করা হয়।
  • ওভারড্রাফট (Overdraft): ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা অর্থের অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলনের সুবিধা।
  • বিল ডিসকাউন্টিং (Bill Discounting): বাণিজ্যিক বিলের বিপরীতে অর্থায়ন।
  • লিজ ফাইন্যান্স (Lease Finance): যন্ত্রপাতি বা সরঞ্জাম ব্যবহারের জন্য লিজ সুবিধা।

এসএমই ঋণ পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র:

বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নীতিমালা অনুযায়ী কাগজের তালিকা কিছুটা ভিন্ন হতে পারে, তবে সাধারণভাবে নিম্নলিখিত কাগজপত্রগুলো প্রয়োজন হয়:

১. ব্যবসায়িক সত্তার প্রমাণপত্র:

  •       একক মালিকানার ক্ষেত্রে: ট্রেড লাইসেন্স (সর্বশেষ)।
  •       অংশীদারি কারবারের ক্ষেত্রে: অংশীদারি চুক্তিপত্র এবং ট্রেড লাইসেন্স (সর্বশেষ)।
  •       প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির ক্ষেত্রে:

o   রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট (সার্টিফিকেট অব ইনকর্পোরেশন)।

o   মেমোরান্ডাম অফ অ্যাসোসিয়েশন (MoA) ও আর্টিকেলস অফ অ্যাসোসিয়েশন (AoA)।

o   পরিচালকগণের তালিকা ও তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র।

o   ট্রেড লাইসেন্স (সর্বশেষ)।

  •       অন্যান্য আইনি সত্তার ক্ষেত্রে: প্রযোজ্য নিবন্ধন ও পরিচালনার কাগজপত্র।

২. মালিক/উদ্যোক্তা/পরিচালকদের ব্যক্তিগত কাগজপত্র:

  •       জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) অথবা পাসপোর্ট (সত্যায়িত ফটোকপি)।
  •       পাসপোর্ট সাইজের ছবি (সাধারণত ২-৪ কপি)।
  •       ঠিকানার প্রমাণপত্র (যেমন – সাম্প্রতিক ইউটিলিটি বিল, ভোটার আইডি কার্ড)।
  •       টিআইএন (Tax Identification Number) সার্টিফিকেট (যদি থাকে)।

৩. আর্থিক বিবরণী ও ব্যবসায়িক তথ্য:

  •       সর্বশেষ তিন বছরের আর্থিক বিবরণী (ব্যালেন্স শিট, লাভ-ক্ষতির হিসাব, নগদ প্রবাহের বিবরণী) – যদি প্রযোজ্য হয়।
  •       ব্যাংক স্টেটমেন্ট (সর্বশেষ ৬-১২ মাসের)।
  •       বর্তমান ব্যবসার প্রকৃতি ও কার্যক্রমের বিস্তারিত বিবরণ।
  •       প্রকল্পের প্রোফাইল (নতুন উদ্যোগের ক্ষেত্রে)।
  •       বিক্রয় ও ক্রয় সংক্রান্ত তথ্য।
  •       আয়কর পরিশোধের প্রমাণপত্র (যদি থাকে)।
  •       অন্যান্য প্রাসঙ্গিক আর্থিক দলিলপত্র।

৪. জামানত সংক্রান্ত কাগজপত্র (যদি প্রয়োজন হয়):

  •       স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে: মালিকানার দলিল, খাজনা রসিদ, পরচা ইত্যাদি।
  •       অস্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে: পণ্যের বিবরণ, ক্রয় রসিদ, বীমা সংক্রান্ত কাগজপত্র ইত্যাদি।
  •       ব্যক্তিগত গ্যারান্টির ক্ষেত্রে: গ্যারান্টরের ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য এবং কাগজপত্র।

৫. অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র:

  •       ঋণের আবেদনপত্র (ব্যাংক/আর্থিক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সরবরাহকৃত)।
  •       পরিবেশ ছাড়পত্র (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)।
  •       অন্যান্য ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাথে ঋণ সংক্রান্ত তথ্য (যদি থাকে)।
  •       ব্যাংক কর্তৃক চাহিত অন্য কোনো প্রাসঙ্গিক কাগজপত্র।

এসএমই ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শর্তাবলি:

ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে আবেদনকারী এবং তাদের ব্যবসাকে কিছু নির্দিষ্ট শর্তাবলি পূরণ করতে হয়। এই শর্তাবলি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ভেদে ভিন্ন হতে পারে, তবে সাধারণভাবে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বিবেচনা করা হয়:

  •       ব্যবসায়ের বয়স: সাধারণত ব্যবসাটি কমপক্ষে ১-৩ বছর দরে চালু থাকতে হয়। নতুন উদ্যোগের ক্ষেত্রে বিশেষ শর্তাবলি প্রযোজ্য হতে পারে।
  •       আর্থিক সক্ষমতা: ব্যবসার নিয়মিত আয়, লাভজনকতা এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা মূল্যায়ন করা হয়।
  •       ঋণ পরিশোধের ইতিহাস: আবেদনকারী বা ব্যবসার পূর্বে কোনো ঋণ থাকলে তার পরিশোধের রেকর্ড খতিয়ে দেখা হয়।
  •       ব্যবস্থাপনার দক্ষতা: উদ্যোক্তা বা পরিচালকদের ব্যবসায়িক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা মূল্যায়ন করা হয়।
  •       জামানত: ঋণের পরিমাণের উপর ভিত্তি করে জামানতের প্রয়োজন হতে পারে। জামানত স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি অথবা ব্যক্তিগত গ্যারান্টি হতে পারে।
  •       আইনগত বাধ্যবাধকতা: ব্যবসার সকল প্রকার আইনি অনুমোদন ও লাইসেন্স থাকতে হবে।
  •       ক্রেডিট স্কোর: আবেদনকারীর ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক ক্রেডিট স্কোর ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
  •       ঋণের উদ্দেশ্য: ঋণের অর্থ কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হয় এবং তা যৌক্তিক ও উৎপাদনমুখী হতে হয়।

এসএমই ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে বিবেচ্য বিষয়:

ঋণের জন্য আবেদন করার আগে একজন এসএমই উদ্যোক্তার কিছু বিষয় বিবেচনা করা উচিত:

  •       প্রয়োজনের সঠিক মূল্যায়ন: ব্যবসার জন্য কত টাকা ঋণের প্রয়োজন এবং ঋণের ধরণ কী হবে তা সঠিকভাবে নির্ধারণ করা জরুরি।
  •       বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঋণের তুলনা: বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণের সুদহার, সার্ভিস চার্জ এবং অন্যান্য শর্তাবলি তুলনা করে নিজের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ঋণটি বেছে নেওয়া উচিত।
  •       কাগজপত্র প্রস্তুত রাখা: ঋণের আবেদন প্রক্রিয়াকরণের সময় বাঁচানোর জন্য প্রয়োজনীয় সকল কাগজপত্র আগে থেকেই গুছিয়ে রাখা উচিত।
  •       ব্যাংকের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা: নিয়মিত লেনদেন এবং সঠিক তথ্য প্রদানের মাধ্যমে ব্যাংকের সাথে একটি ভালো সম্পর্ক তৈরি করা ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
  •       শর্তাবলি ভালোভাবে বোঝা: ঋণের সকল শর্তাবলি, যেমন – সুদহার, পরিশোধের সময়সীমা, সার্ভিস চার্জ ইত্যাদি ভালোভাবে বুঝে নেওয়া উচিত।
  •       আইনি পরামর্শ: প্রয়োজনে ঋণ সংক্রান্ত বিষয়ে আইনি পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।

বাংলাদেশের এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ঋণ সুবিধা প্রদান করলেও, ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয় এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হয়। একজন উদ্যোক্তা যদি সঠিক প্রস্তুতি নিয়ে এবং প্রয়োজনীয় শর্তাবলি পূরণ করে ঋণের জন্য আবেদন করেন, তবে তার ব্যবসায়িক লক্ষ্য অর্জন সহজ হতে পারে। উপরিউক্ত তথ্য একজন এসএমই উদ্যোক্তাকে ঋণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা দিতে সহায়ক হবে।