বর্তমানে আমাদের দেশে মাছ চাষের রূপ পাল্টে গেছে। এখন মাছ চাষের অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম হচ্ছে অ্যাকোয়ারিয়াম। অ্যাকোয়ারিয়ামে অনেকে শখ করে চাষ করেন। অ্যাকোয়ারিয়ামে মাছ চাষ আমাদের দেশে নতুন হলেও অনেক লোক এটাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং সফলতা অর্জন করছে। বাংলাদেশে অ্যাকোয়ারিয়ামে মাছ চাষের রয়েছে ব্যাপক সম্ভাবনা। কারণ এ দেশের আবহাওয়া ও পরিবেশ দুটিই মাছ চাষের জন্য উপযোগী। অ্যাকোয়ারিয়ামে মাছ চাষ অনেক সুবিধা ও সহজ এবং লাভজনক হওয়ার কারণে এ পেশার মাধ্যমে অনেকেই বেকারত্ব দূর করার পাশাপাশি ব্যাপক আত্মকর্মসংস্থানের সৃষ্টি করছে।
আমাদের দেশে সাধারণত ১০০ প্রজাতির মাছ অ্যাকোয়ারিয়ামে চাষ করা হয়। তার মধ্যে গোল্ড ফিশ, কমেট, কই কাপ, ব্লাক মোর, সাকার, মোরি, সটটেল, এনজেল, কিসেন্ট গোড়ামি, ছোট টাইগার, টাইগার বার, গাপ্পি, বাবুলাই সিলভার, সিলভার সার্ক, ল্যাকমার, জাপানি, সুভান কিং, এরোনা, অস্কার, রেড প্যারোড, ডিসকাস উল্লেখযোগ্য। এসব প্রজাতির মাছের মধ্যে গোল্ড ফিশ মাছের আবার অনেক প্রজাতি আছে। যেমন টেনিকো, লিচু গোল্ড ফিশ, অরেন্ডা, রেড ক্যাম্প ইত্যাদি।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, ডিসকাস মাছের একটা নিজস্ব ব্যতিক্রম ধর্ম আছে। তা হলো ডিসকাস মাছ ছোট থেকে যতো বড় হয় এর চেহারা এবং রঙ পরিবর্তিত হতে থাকে। এ মাছের চেহারা হয়ে ওঠে আরো মনোরম এবং আকর্ষণীয়। এজন্য অনেকেই শখের বশে ডিসকাস মাছ চাষ করে।
অ্যাকোয়ারিয়ামে মাছ চাষের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এ মাছের খাবারগুলো খুবই সস্তা এবং ঘন ঘন খাদ্য দিতে হয় না। দিনে একবার খাদ্য দিলেই এ মাছ পরিমিত পরিমাণ বৃদ্ধি পায় এবং স্বাভাবিকভাবে সুস্থ থাকে। অ্যাকোয়ারিয়ামে মাছের যেসব খাদ্য দেয়া হয় তা হলো নোবা, ওসাকা, সিপি, গ্রিন ইত্যাদি। এ খাদ্যগুলো যে কোনো অ্যাকোয়ারিয়াম ফিশারি দোকানে সুলভ মূল্যে পাওয়া যায়। এছাড়াও পোকা নামে এক প্রকার খাদ্য অ্যাকোয়ারিয়ামের মাছ খায়। যা মাছের জন্য খুবই উপকারী। অ্যাকোয়ারিয়ামে যেসব মাছ চাষ করা হয় এগুলোর দাম খুবই সস্তা। প্রতি পিস মাছের দাম ৩৫ থেকে ৪০ টাকা।
আমাদের দেশে বিভিন্ন সাইজের অ্যাকোয়ারিয়ামে মাছ চাষ করা হয়। তবে একটি মাঝারি সাইজের অ্যাকোয়ারিয়াম হলো আড়াই ফুট। এর দাম মাত্র ৩ হাজার টাকা। এ অ্যাকোয়ারিয়ামের মধ্যে ১৫-২০টি মাছ চাষ করা যায়। অ্যাকোয়ারিয়ামের মধ্যে পানির নিচের ছোট ছোট এক ধরনের পাথর থাকে যাকে মোজাইক পাথর বলে। আড়াই ফুট একটি অ্যাকোয়ারিয়ামের মধ্যে সাধারণত ১০ কেজি মোজাইক পাথর লাগে। এ মোজাইক পাথরের দামও অনেকটা কম। প্রতি কেজি মাত্র ১০ টাকা।
অ্যাকোয়ারিয়ামের মধ্যে মোজাইক পাথর দিলে মাছ এ পাথরের সঙ্গে খেলা করে। ফলে মাছের চলাফেরা গতিবিধি লক্ষ করা যায় এবং অ্যাকোয়ারিয়ামের মধ্যকার পরিবেশ ঠিক থাকে। অনেকেই অ্যাকোয়ারিয়ামের মধ্যে বিভিন্ন পাতা, ফুল দিয়ে থাকে। এটা একদিকে যেমন অ্যাকোয়ারিয়ামকে সুন্দর দেখায় অন্যদিকে মাছের পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষা থাকে।
অ্যাকোয়ারিয়ামের ভেতরে সংযুক্ত থাকে একটি ফিল্টার পাইপ, যা অ্যাকোয়ারিয়ামের ভেতর অক্সিজেনের উৎস হিসেবে কাজ করে। এ ফিল্টার পাইপ বাইরে মোটরের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। অনেকেই বলে থাকেন মোটর না চললে অ্যাকোয়ারিয়ামের মাছ মারা যায়। কিন্তু এ কথাটি সম্পূর্ণ সত্য নয়। ২ থেকে ৩ ঘণ্টা মোটর না চললে মাছ মারা যায় না।
এছাড়া অ্যাকোয়ারিয়ামের সঙ্গে অটো হিটার সংযুক্ত রাখলে অ্যাকোয়ারিয়ামের ভেতরের পরিবেশ ও তাপমাত্রার ভারসাম্য ঠিক থাকে। অ্যাকোয়ারিয়ামে মাছ চাষে একটি বাড়তি সুবিধা আছে। এ মাছগুলো অ্যাকোয়ারিয়ামের মধ্যেই ডিম দেয় এবং এখানেই পোনা ছাড়ে। এ পোনা ছাড়ার সময় মাছের সঠিক যত্ন নিতে হয়। ফলে রোগমুক্ত, সতেজ, ভালোমানের পোনা পাওয়া যায়।
এক্ষেত্রে অ্যাকোয়ারিয়ামের পানি ও পানির তাপমাত্রার দিকে অবশ্যই লক্ষ রাখতে হবে। এর মধ্যকার পানি এক মাস পরপর পরিবর্তন করতে হয়। অ্যাকোয়ারিয়ামের মধ্যে পানি দেয়ার আগে কিছু মেডিসিন যেমন রেনামাইসিন দিলে পানি বিশুদ্ধ থাকে এবং পানিজনিত রোগবালাই হয় না।
অ্যাকোয়ারিয়ামে মাছ চাষের অন্যতম সুবিধা হলো এখানে মাছের সাধারণত কোনো রোগবালাই হয় না। তবে কিছুটা সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। অর্থাৎ স্বাভাবিক তাপমাত্রায় রাখতে হয়।
অ্যাকোয়ারিয়ামে মাছ চাষের সফলতা এবং সম্ভাবনা সম্পর্কে ‘ফিশ পার্ক অ্যাকোয়ারিয়াম সেন্টার’-এর মালিক এস এম ঈমানের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, ‘আমাদের দেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে অ্যাকোয়ারিয়ামে মাছ চাষ অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশেষ অবদান রাখছে। পাশাপাশি ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করছে।
অ্যাকোয়ারিয়ামে মাছ চাষ আমাদের দেশে নতুন হলেও দিন দিন এর চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশের অগ্রগতি ও উন্নয়নের দিক দিয়ে অ্যাকোয়ারিয়ামে মাছ চাষ ব্যাপক ভূমিকা পালন করছে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।
[তথ্যসূত্র : দৈনিক পত্রিকা থেকে]
