Home দরকারি তথ্য বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারী পর্যায়ের ম্যানুফেকচারিং বিজনেসের প্রেক্ষাপট ও কিছু কঠোর বাস্তবতা

বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারী পর্যায়ের ম্যানুফেকচারিং বিজনেসের প্রেক্ষাপট ও কিছু কঠোর বাস্তবতা

0
বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারী পর্যায়ের ম্যানুফেকচারিং বিজনেসের প্রেক্ষাপট ও কিছু কঠোর বাস্তবতা

২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যবর্তি আয়ের দেশে পরিনত হবে এরকম একটা প্রচারনা এখন অব্যাহত আছে এবং একজন দেশেপ্রেমিক হিসেবে আমি সহ যে কেউ এটাকে সমর্থন ও সাধুবাদ জানাই এবং একই সঙ্গে এটা করা যে সম্ভব তা বিশ্বাসও করি। তবে এটা কোন গালভরা বুলি বা যাদু মন্ত্র দিয়ে হবেনা। এজন্য সবার আগে যেটা দরকার সেটা হচ্ছে আমাদেরকে আরো বেশী বেশী করে ম্যানুফেকচারিং ব্যবসা গড়ে তুলতে হবে।

যখন থেকে এই দেশে উদ্যোক্তা আন্দোলন বা উদ্যোক্তা কালচার তৈরিতে নানারকম সচেতনতামুলক কার্যক্রম শুরু হয়েছে, তখন থেকে এখন পর্যন্ত শতকরা হিসেবে যদি বলি তাহলে দেখবো তরুনদের মধ্যে নতুন উদ্যোক্তা যারা হয়েছেন তাদের মধ্যে ৫% ও ম্যানুফেকচারিং বিজনেস করছেন বা করতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন এমনটা দেখা যাবেনা। এর পেছনে অবশ্যই যুক্তিসঙ্গত নানা কারন থাকতে পারে তবে আমার মূল আলোচ্য বিষয় এটা নিয়ে নয়।

আগে থেকেই বা নতুন করে যারাই এই দেশে ম্যানুফেকচারিং বিজনেস করছেন তাদের যেসব সীমাবদ্ধতা ও নানান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয় আজকে সেগুলো নিয়েই একটু আলোকপাত করবো। আমি সব সময় তরুনদেরকে ম্যানুফেকচারিং বিজনেসে উৎসাহিত করি সঙ্গে এটাও জানিয়ে দিতে চাই যে এখানে কি কি জটিলতা, প্রতিবন্ধকতা আছে।

১) এই দেশে যেহেতু মৌলিক বা মধ্যবর্তি/সেমি ফিনিসড্‌ কোন প্রোডাক্টের উৎপাদন হয়না, তাই যে কোন ফিনিসড্‌ প্রোডাক্ট তৈরি করতে চাইনা কেনো, এটার র’মেটেরিয়াল সম্পূর্ণ আমদানী নির্ভর। ফলে যারা ক্ষুদ্র ও মাঝারী উদ্যোক্তা তাদের জন্য র’মেটেরিয়ালের স্মুথ সাপ্লাই চেইন একটা বিরাট ঝামেলা। এসএমই শিল্পোদ্যোক্তাদের বেশীরভাগের পক্ষে সম্ভব হয়না সরাসরি ইম্পোর্ট করা, ফলে কমার্শিয়াল ইম্পোর্টারদের কাছ থেকেই সাধারনত সংগ্রহ করতে হয়। একটা উদাহরন দেইঃ ধরা যাক X নামের একটা প্রোডাক্ট কেউ বানায় এবং এটাতে ৫/৬টা র’মেটেরিয়াল লাগে যার সবই ইম্পোর্টেড এবং কমার্শিয়াল ইম্পোর্টারের হাত ঘুরে হোল সেলাদের কাছ থেকে কিনতে হয়। একজন ম্যানুফেকচারার হিসেবে যদি সেগুলো র’মেটেরিয়াল ঘোষণা দিয়ে সরাসরি ইম্পোর্ট করা যায় তাহলে প্রায় ২০% থেকে ৩০% ডিউটি/ট্যাক্স মওকুফ পাওয়ার সুযোগ আছে। কিন্তু সবার পক্ষে সম্ভব নয়  ১/২ কোটি টাকা শুধুমাত্র র’মেটেরিয়ালের জন্য ইনভেস্ট করা তাই বাধ্য হয়ে কমার্শিয়াল ইম্পোর্টার/হোল সেলারদের কাছ থেকেই নিতে হয় এবং সেই সঙ্গে ডিউটি/ট্যাক্স মওকুফ পাওয়ার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে হয়। এরফলে যেটা হয়, একজন সমপর্যায়ের বিদেশী মেনুফেকচারার থেকেও এদেশের মেনুফেকচারারদের র’মেটেরিয়াল কস্টিং বা কস্ট অব প্রডাকশন বেশী পড়ে যায়।

এরপরে আছে আরো হুজ্জতি। অনেক সময় দেখা যায় ৪/৫টা কাঁচামালের মধ্যে একটা পাওয়া যাচ্ছে তো আরেকটা পাওয়া যাচ্ছেনা, অথবা পাওয়া গেলেও দাম দিগুন হয়ে গেছে। তখন কি করার আছে? হয় দিগুন দাম দিয়ে কিনে প্রোডাকশন করে এবং লস দিয়ে প্রডাক্ট বিক্রি করতে হয় নয়তো পুরো প্রডাকশন বন্ধ রাখতে হয়। পুরো প্রডাকশন বন্ধ রাখলে আবার যে ফিক্সড্‌ কস্ট্‌ আছে সেটার বোঝা টানতে হয়, ব্যাংক লোন থাকলে সেটার কিস্তি ডিফল্ডার হয়ে যেতে হয়।

২) আচ্ছা, ধরা যাক র’মেটেরিয়ালের সমস্যার সমাধান কোনমতে করেছেন, এখন প্রডাকশন করবেন। মেশিনপত্র, ইকুইপমেন্টস্‌, টেকনোলজি, প্রসেস এসবে যদি নিজের জানাবোঝা/দক্ষতা  না থাকে তাইলে পুরাই মরছেন। আর যদি দক্ষতা থাকে তাইলেও এটা মনে করার কোন কারন নাই যে অনেক শান্তি আর আরামে দিন কাটবে। যেকোন ফ্যাক্টরি চালালে একটা কমন বিষয় হচ্ছে, নির্ধারিত সময়ের ব্যাবধানে মেইনটেনেন্স/রিপেয়ার। আমাদের দেশে ইন্ডাস্ট্রিয়াল টেকনিক্যাল এসিস্টেন্স যা আছে তা হচ্ছে কাজীর গরুর মত যা কেতাবে আছে কিন্তু বাস্তবে নাই। একটা শিক্ষিত পাশ করা গ্র্যাজুয়েট ইঞ্জিনিয়ার আছে এরকম কোন ওয়ার্কশপ/মেশিন শপ আপনি সারা বাংলাদেশে শত খুঁজেও পাবেননা। সব হচ্ছে স্বল্প শিক্ষিত বা অশিক্ষিত টেকনিশিয়ান দ্বারা পরিচালিত। এটা ঠিক এদের অনেকের কারিগরি দক্ষতা প্রশ্নাতীত কিন্তু মেজারমেন্ট, ক্যালকুলেশন বলে তো একটা বিষয় আছে যেটা তারা সঠিকভাবে করতে পারেনা, ফলে খরচ কম বা বেশী যাই হোক কিন্তু যেকোন কাজেই অনেক ডিফেক্টের মুখোমুখি হতে হয় যার কোন সমাধান নাই। এরপরে আছে আরেক কাহিনী, এমন অনেক ছোটখাট টুলস বা পার্টস/কনজ্যুমেবল স্পেয়ার আছে, যা আপনার জরুরী দরকার কিন্তু এইটা সারা পৃথিবীতে পাওয়া যায় অথচ বাংলাদেশে পাওয়া যায়না। হয়তো গোরুখোঁজা খুঁজে ভাগ্যক্রমে কোথাও কারো কাছে পাইছেন, এইবার যে দাম শুনবেন তাতে আপনার আরেকটু হলে হার্টফেল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। তারপরে আছে ইলেক্ট্রিসিটি ঘাটতি। এইটার জন্য প্রোডাকশনের যে হ্যাম্পার হয় তার জন্য মাঝে মাঝে রাগে দুঃখে আপনার মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছা করবে।

৩) যাক, আপনি টেকনিক্যাল বিষয়টাও সামাল দিয়েছেন এবং চমৎকার ফিনিসড্‌ প্রোডাক্ট প্রডিউসে সমর্থ হয়েছেন, এখন মার্কেটিং করবেন, বাজারে যাবেন বিক্রি করতে, তো সেখানে যেসব ফ্যাঁকড়ার মধ্যে পড়বেন তা কয়েকটা সেগমেন্টে উল্লেখ করা লাগবে।

*** আপনি যেহেতু ছোটখাট ম্যানুফেকচারার তাই আপনার পক্ষে সম্ভব না ডাইরেক্ট ফাইনাল কন্স্যুমারদের কাছে সেল করা। আপনাকে হোলসেলার/রিটেইলারের শরণাপন্ন হতে হবে, তাদের কাছে সেল করতে হবে। বাংলাদেশের ট্রেডিং বিজনেসের যে সিচুয়েশন তা হচ্ছে পৃথিবীর সর্বনিকৃষ্ট একটা সিস্টেটেমেটিক ওয়ে। এখানে ব্যবসা বানিজ্যের নুন্যতম কোন নীতি নৈতিকতা বা ন্যায্যতার বালাই নাই। কে কাকে ঠকিয়ে শুধু নিজে জিতবে এইটা হচ্ছে কমন ট্রেন্ড। বাংলাদেশের ট্রেডিং সেক্টরের এই যে সিস্টেম, এখানে উৎপাদক এবং ভোক্তা উভয়েই সব সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয় কিন্তু ট্রেডাররা টাকার পাহাড় গড়ে।

*** মার্কেটিং সংক্রান্ত কোন বিষয়ে ডিসিশন নিতে আপনি হয়ত কোন সার্ভে করতে চান, তো সেক্ষেত্রে আপনি সংশ্লিষ্ট সেক্টরের বিখ্যাত ব্যবসায়ী জনাব সলিমুল্লাহ, করিমুল্লাহ, গরীবুল্লাহ এদের কাছে গেলেন আপনার কোন জিজ্ঞাসা নিয়ে, দেখবেন তিনজন আপনাকে তিনরকম তথ্য দিচ্ছে। এই তথ্য কোনোটা আপনার স্বার্থরক্ষা করে দেওয়া হয়নি, সব তাদের নিজেদের স্বার্থরক্ষা করে বলা। এখন আপনি যদি সেই সেক্টরের অনেকদিনের অভিজ্ঞ না হয়ে থাকেন ও তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ডিসিশন নেন তো আপনি যে ধরা খাবেন তা ১০০% নিশ্চিত।

*** আপনার ফিনিসড্‌ প্রোডাক্টের সমজাতীয় বিদেশী প্রোডাক্ট (বিশেষ করে চায়না ও ইন্ডিয়ারটা) যখন দেশে ইম্পোর্ট হয়েছে তখন সঠিক ভাবে ডিউটি/ট্যাক্স এসব যদি পরিশোধ হতো তাহলে আপনার প্রাইসিং ডিসিশনে যথেষ্ট স্বাচ্ছন্দ্য পেতেন। কিন্তু সে উপায় নেই। আন্ডার ইনভয়েস আর নানান কারসাজী করে ডিউটি/ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে ইম্পোর্টাররা দেশের বাজারে প্রডাক্ট নিয়ে আসেন। ফলে একদিকে আপনি র’মেটেরিয়ালে বেশী খরচ করেছেন অন্যদিকে বিক্রয়মুল্য নির্ধারনেও বিদেশী প্রডাক্টের সঙ্গে অনেক প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়ছেন। আবার আছে হোলসেলার/রিটেলারদের মামার বাড়ির আবদার। তারা বিদেশেরটা বিক্রি করে ১০ টাকা প্রফিট করলেও অনেক খুশি, কিন্তু আপনারটা মানে বাংলাদেশিটা বিক্রি করে সেখানে ৫০ টাকা প্রফিট না করলে তাদের পোষায়না। এছাড়াও বিদেশিটা তারা ক্যাশ টাকা দিয়ে কিনে দোকান/গোডাওন ভরপুর করে রাখার সময় তাদের কোন সমস্যা হয়না, কিন্তু আপনারটা বাকিতে দিতে হবে। বিক্রি করতে পারলে টাকা পাবেন। আবার দেখা যাবে কেউ কেউ সব বিক্রি করেছে কিন্তু পুরো টাকা পরিশোধ করতে গড়িমসি করবে। নানা রকমের ধানাই পানাই করবে কিভাবে সেখান থেকে আবারো একটা ডিস্কাউন্ট নিতে পারে। আপনি রাজি না হলে তখন দেখা যাবে আপনার কাছ থেকে আর মাল নিতে রাজি না, সে বাকিতে দিলেও।

তাহলে কি দাঁড়ালো? সব কিছুতে আপনি ঠকছেন এবং অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে হয়তো বিজনেস কন্টিনিউ করে যাচ্ছেন কিন্তু যে ফ্যাক্টরি চালিয়ে অন্যদেশের উদ্যোক্তারা বিরিয়ানি খাচ্ছে, আপনি কোনমতে ডাল ভাত খেতে পাচ্ছেন। মাছ মাংশও জুটবেনা, বিরিয়ানিতো অনেক দুরের বিষয়। তো এরপরে আপনার কাছে এটাই মনে হবে, – – – কেনো যে শিল্পোদ্যোক্তা হতে গেছিলাম। এর চেয়ে ১০টা রিকশা কিনে একটা নিজে চালাইতাম আর ৯টা অন্যদেরকে ভাড়া দিতাম, তাইলেও মনে হয় অনেক রোজগার হইতো আর শান্তিতে থাকতাম।

———————————————————————–

আমার এই লেখাটা পড়ে কেউ হতাশ হয়ে আতংকিত বোধ করলে আমি বলবো, আপনি শিল্পোদ্যোক্তা হওয়ার কথা ভুলেও চিন্তা কইরেন না। এতো এতো সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও এই দেশে হাজার হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারী শিল্পোদ্যোক্তা আছে এবং প্রতিদিন নতুন করে অনেকেই শিল্পোদ্যাক্তা হচ্ছেন, তারা সবাই এটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নিয়েছে এবং অনেক এনজয় করে এই সংগ্রাম। “মেইড ইন বাংলাদেশ” বাক্যটা বুকের মধ্যে এক প্রকান্ড ঝড় তোলে যার কারনে আমরা অনেকেই ঝাঞ্জা বিক্ষুব্ধ উত্তাল ঢেউয়ের সাগরে সামান্য ডিঙ্গি নৌকা নিয়েই বেড়িয়ে পড়েছি। এক্ষেত্রে একমাত্র ভরসা সাহস আর “আমরা একদিন না একদিন পারবো বাংলাদেশকে শিল্পোন্নত দেশে পরিনত করতে” সেই আশা। এছাড়া আর কিছু নেই আমাদের।

লেখক-  Nur Uddin